
সাম্প্রতিক সময়ে বরাদ্দপত্রের বাইরে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ, দায়িত্বে অবহেলা, নির্দেশনা অমান্য এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রাপ্ত একাধিক দাপ্তরিক নথি, অফিস আদেশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কয়েকটি ধারাবাহিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ, প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।
সূত্র অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের ডিজিএম (ডিএলও—অ.দা.) সৈয়দ শফিকুর রহমানকে কেন্দ্র করে বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় অসংগতি এবং প্রশাসনিক নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগ আসে। মোংলা, ফতুল্লা, গুলশান এবং বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেল বরাদ্দ ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এসব অনিয়ম চলছে। পাইপলাইন থেকে তেল গায়েব, ট্যাংকলরির ধারণক্ষমতা পরিবর্তন করে অতিরিক্ত তেল সরানো এবং অবৈধ মজুতের মতো বিষয়গুলো নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময় আলোচনা হলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রশাসনিক ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক সূত্র।
বড় একটি অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে গত ২৯ মার্চ মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনে সংঘটিত একটি ঘটনায়। ওই দিন মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ) মো. মাসুদুল ইসলামের স্বাক্ষরিত একটি দাপ্তরিক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ডিপো প্রধানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয় এবং পরে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন, যা প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস রুলসের একাধিক ধারার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একই সঙ্গে ওই রাতেই যৌথবাহিনীর একটি দল মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনের তিনটি ট্যাংকে ডিজেল পরিমাপ করে এবং অফিসে সংরক্ষিত স্টক রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, ১২ হাজার ৬১৩ লিটার ডিজেল অতিরিক্ত মজুত রয়েছে। প্রশাসনের দৃষ্টিতে এই অতিরিক্ত মজুত একটি গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয়টি সামনে আসে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, স্থানীয় জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও পুলিশের যৌথ দল খুলনার বাগেরহাটে অবস্থিত মোংলা অয়েল ইনস্টলেশনে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় ব্যবস্থাপক (অপারেশন) মো. আল আমিন খানের নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্টক রেজিস্টার ও নথিপত্র উপস্থাপন করেন। পরে মেজারিং টেপ ব্যবহার করে তিনটি ট্যাংকের তেলের পরিমাণ সরাসরি পরিমাপ করা হয় এবং তা নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। এতে অবৈধভাবে মজুত করা ১২ হাজার ৬১৩ লিটার অতিরিক্ত জ্বালানি তেল পাওয়া যায়। এর মূল্য প্রায় ১২ লাখ ১০ হাজার ৮৫০ টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির দাপ্তরিক নথিতে আরও বলা হয়, যৌথবাহিনীর পরিদর্শনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন না এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি। ডিপো প্রধান হিসেবে স্টক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও হিসাব সংরক্ষণের পূর্ণ দায়িত্ব তার ওপর বর্তায়—এমন ব্যাখ্যা দিয়ে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। চিঠি পাওয়ার সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং একই সঙ্গে সাময়িক বরখাস্ত আদেশ জারি করে তাকে প্রধান কার্যালয়ের মানব সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করা হয়।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই ৫ এপ্রিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সামনে আসে। ওই দিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশে ডিজিএম (ডিএলও—অ.দা.) সৈয়দ শফিকুর রহমানকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর এক পরিচালকের যৌথভাবে প্রস্তুত করা বিশেষ প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে তেল বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় নিয়ম অনুসরণ না করা এবং প্রশাসনিক নির্দেশনা উপেক্ষার অভিযোগ তুলে ধরা হয়, যা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের পরিপন্থি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছিল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার। কিন্তু প্রথম অফিস আদেশে তাকে শুধু দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ায় প্রশাসনিক মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বিপিসি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নজরে এলে নতুন করে আরেকটি অফিস আদেশ জারি করা হয় এবং সেখানে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে গত ৭ এপ্রিল। ওইদিন নারায়ণগঞ্জ জেলার কয়েকটি ডিপো পরিদর্শনের সময় তেল বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় একাধিক অসংগতি ধরা পড়ে। বেলা ১১টায় সরকারি কর্মকর্তাদের একটি দল ফতুল্লা এলাকার একটি যমুনা ডিপো পরিদর্শন করে এবং বরাদ্দপত্র, চালান ও হিসাবপত্র যাচাই করে দেখতে গিয়ে বরাদ্দপত্রের বাইরে অতিরিক্ত তেল সরবরাহের প্রমাণ পান। কয়েকটি ফিলিং স্টেশনকে নির্ধারিত বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ডিজেল ও অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব অতিরিক্ত সরবরাহের ক্ষেত্রে লিখিত অনুমোদনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ডিপো ইনচার্জকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, নির্ধারিত বরাদ্দ দেওয়ার পর প্রায়ই ফোনকল বা বার্তার মাধ্যমে অতিরিক্ত সরবরাহের নির্দেশনা পাওয়া যেত, যার ফলে বাস্তবে বরাদ্দপত্র ও সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতো এবং হিসাব ব্যবস্থাপনায় অসংগতি দেখা দিত।
একই প্রতিবেদনে বরাদ্দপত্রে স্বাক্ষর সংক্রান্ত একটি অনিয়মও উল্লেখ করা হয়েছে। দেখা গেছে, বরাদ্দপত্রের প্রতিটি পাতায় স্বাক্ষর করার নিয়ম থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা শুধু শেষ পাতায় স্বাক্ষর করেছেন। পরিদর্শনের সময় বিষয়টি ব্যাখ্যা চাওয়া হলে দ্রুত নতুন বরাদ্দপত্র পাঠানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসনের মতে, এ ধরনের আচরণ প্রশাসনিক নিয়ম লঙ্ঘনের পাশাপাশি নথিপত্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
এই ধারাবাহিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আবারও কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয় এবং তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অফিস আদেশে বলা হয়, সরকারি নির্দেশনা অমান্য, দায়িত্বে অবহেলা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সম্ভাব্য অপব্যবহারের অভিযোগের বিষয়টি বিবেচনায় এনে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে একই সময়ে অবৈধভাবে তেল মজুতের অভিযোগে মোংলা ডিপোর ইনচার্জ আল আমীন খানকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে দাপ্তরিক সূত্র জানিয়েছে। একাধিক ঘটনায় ধারাবাহিকভাবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু সূত্র দাবি করেছে, প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় দীর্ঘদিন তেল ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম হয়ে আসছে।
বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে তা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে তেল সরবরাহ ব্যবস্থার হিসাব ও বাস্তব মজুতের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হলে তা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি করে।